চট্টগ্রামের মিরসরাই বিসিক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পরও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। বরাদ্দ দেয়া ৮৮টি প্লটের মধ্যে খালি পড়ে আছে ৫৯টি। ৮০টি কারখানা স্থাপনের কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ১১টি। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট, নিরাপত্তা ও দক্ষ শ্রমিকের অভাব এবং রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত কারণে প্লট মালিকরা দেশের ৭৫তম বিসিক শিল্পনগরীতে কারখানা স্থাপনে আগ্রহী নন।
জানা গেছে, মিরসরাই বিসিক শিল্পনগরীতে ২০২০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে তিনটি কারখানা উৎপাদনে যায়। এরপর ২০২২ সালে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যায় এয়াকুব অটো রাইস মিল নামে একটি প্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ গত ২৪ অক্টোবর এবি কমোডিটিজ নামে একটি কারখানায় পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করে। সব মিলিয়ে গত পাঁচ বছরে মাত্র আটটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে গেছে। এসব কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৫৫ জনের। এদিকে লোকসানের কারণে উৎপাদনে যাওয়া খান অ্যাকসেসরিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে বিসিক কর্মকর্তাদের দাবি, গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদনে যেতে পারছে না অনেক কারখানা। এ বিষয়ে গত বছরের ২১ নভেম্বর চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে চিঠি দিয়েছে বিসিক কর্তৃপক্ষ।
বিসিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন মিরসরাই পৌরসভার পূর্ব তালবাড়িয়া রেলস্টেশন এলাকায় ২০১০-২০১১ অর্থবছর প্রকল্পের জন্য ১৫ দশমিক ৩২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। প্রথম অবস্থায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২২ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় একটি প্রকল্প হাতে নেয় বিসিক। প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীতে ২ কোটি ১ লাখ টাকা বাড়িয়ে ২৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়। ২০১৩ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালের ১২ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে দ্বিতীয় সংশোধিত প্রকল্প আকারে বরাদ্দ বাড়িয়ে ২৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০১৭ সালের জুন মাসে। কাজ শেষ হওয়ার দুই বছর পর বরাদ্দের জন্য ৮৮টি প্লটের বিপরীতে ১১৪টি আবেদনপত্র জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ৮৮ শিল্পোদ্যোক্তাকে প্লট বরাদ্দ দেয় বিসিক চট্টগ্রাম জেলা প্লট বরাদ্দ কমিটি। কিন্তু ১৪ জন শিল্পোদ্যোক্তা সময়মতো অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় প্লটগুলো শূন্য ঘোষণা করা হয়। পরে ১৪টি প্লটের বিপরীতে ৫৬টি আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে অবশিষ্ট ১৪টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। সব মিলিয়ে ৮৮টি প্লট ৮০ জন শিল্পোদ্যোক্তাকে দেয়া হয়েছে। পাঁচ বছরের মধ্যে নয়টি কিস্তিতে প্লটের টাকা পরিশোধ করতে পারবেন তারা। এসব প্লটের প্রতি বর্গফুট জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৮০০ টাকা।
মিরসরাই বিসিক শিল্পনগরীতে এ-টাইপ প্লট ২৭টি, বি-টাইপ প্লট ৩৩টি ও সি-টাইপ প্লট ২৭টি। প্লট বরাদ্দ কমিটি প্রকৌশল খাতে ১৯টি, তৈরি পোশাক খাতে ১৬টি, খাদ্য ও খাদ্যজাত খাতে ১৯টি, কেমিক্যাল অ্যান্ড অ্যালাইড খাতে ১০টি, বন ও বনজাত খাতে তিনটি, প্যাকেজিং খাতে আটটি, সিরামিকস ও নন মেটালিক খাতে তিনটি এবং রাবার, লেদার অ্যান্ড অ্যালাইড খাতে চারটি প্লট বরাদ্দ দিয়েছে।
সরজমিনে মিরসরাই বিসিক শিল্পনগরীতে গিয়ে দেখা যায়, বরাদ্দ দেয়া ৮৮টি প্লটের মধ্যে ৫৯টি প্লট খালি পড়ে রয়েছে। লোকসান হওয়ায় কার্টন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান খান অ্যাকসেসরিজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের সামনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বৃদ্ধ জানান, লোকসানের কারণে প্রায় তিন বছর আগে কারখানাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে বর্তমানে কয়েকটি কারখানার সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি দুটি রাইস মিল চালু থাকতে দেখা গেছে।
বিসিক চট্টগ্রামের শিল্পনগরী কর্মকর্তা মোহাম্মদ তানজিলুর রহমান বণিক বার্তাকে জানান, মিরসরাই বিসিক শিল্পনগরীতে ৮০টি শিল্পকারখানার বিপরীতে বর্তমানে রয়েছে ১১টি, এর মধ্যে উৎপাদনে রয়েছে মাত্র আটটি।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস ও নিরাপত্তার অভাবে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে পারছে না জানিয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘মিরসরাইয়ে বর্তমানে দৈনিক চারবার লোডশেডিং হয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পেলে ছোট কারখানাগুলো চালানো প্রায় অসম্ভব।’—এমন পরিস্থিতিতে গত ২১ নভেম্বর মিরসরাই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে বিসিকের পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।
উৎপাদনে যাওয়া আটটি কারখানা হলো এয়াকুব অটো রাইস মিল, খাজা ভান্ডার, খান অ্যাকসেসরিজ, নাছির কেমিক্যাল, আলিফ ফুড, মেঘনা ডাল মিল, ইনোভা টেক্সটাইল ও এবি কমোডিটিজ। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে ৫৫ জন শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। তবে ইনোভা টেক্সটাইল পুরোপুরি চালু হলে আরো কয়েকশ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ২৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন।
বিসিক চট্টগ্রামের ডিজিএম এসএমএম আলমগীর আল কাদেরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মিরসরাই বিসিক শিল্পনগরীটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো, তাই চাহিদাও বেশি। কিন্তু এখানে বিদ্যুতের যে লাইন রয়েছে সেটি সাধারণ সংযোগ। পাশাপাশি গ্যাসের সংকটও রয়েছে। মূলত এ দুটি কারণে উদ্যোক্তারা কারখানা নির্মাণে বিলম্ব করছেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। তাই এ শিল্পনগরীতে বিদ্যুতের বাণিজ্যিক সংযোগের জন্য মিরসরাই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে চিঠি দিয়েছি।’ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সুবিধা পেলে দ্রুত শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেন বিসিকের এ কর্মকর্তা।